ইমাম শাফেয়ীর মত কি বুকে হাত বাঁধা?

আল হেদায়া কিতাবের বক্তব্য নিয়ে লা-মাযহাবীদের মাতামাতি…! ইমাম শাফেয়ীর মত কি বুকে হাত বাঁধা?
.
—সামীউর রহমান শামীম
.
কিছু লা-মাযহাবী, তথাকথিত আহলে হাদীস ভাইয়েরা নামাযে বুকে হাত বাঁধতে হবে এ বিষয়ে ইমাম শাফেয়ী (রহ.)'র বক্তব্য উল্লেখ করতে গিয়ে ফিকহে হানাফীর কিতাব ‘‘আল হিদায়া শরহুল বিদায়াতুল মুবতাদী’’ কিতাবের বাংলা অনুবাদ হতে একটি বক্তব্য উল্লেখ করছে। সেখানে বলা হয়েছে, ইমাম শাফেয়ী (রহ.)'র মত ছিল বুকে হাত বাঁধা। এ বিষয়টি খুব জোর-শোরের সাথে তারা প্রচার করছে। এর কিছু জবাব দেয়া মুনাসেব মনে হলো। তাই জাবাব লিখলাম।
.
আল হিদায়া শরহুল বিদায়াতুল মুবতাদী কিতাবে, গ্রন্থাকার ইমাম আল মারগীনানী (রহ.) লিখেছেন,
.
ﻭﺍﻟﺸﺎﻓﻌﻲ ﺭﺣﻤﻪ ﺍﻟﻠﻪ ﻓﻲ ﺍﻟﻮﺿﻊ ﻋﻠﻰ ﺍﻟﺼﺪﺭ
.
অর্থাৎ ‘‘…এটা আমাদের (হানাফীদের) পক্ষে ইমাম শাফেয়ী (রহ.)'র বুকে হাত রাখার মতের বিপরীতে দলীল।’’
.
[আল হিদায়া, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩১৪; প্রকাশনায়ঃ ইদারাতুল কুরআন ওয়া উলূম আল ইসলাম; প্রথম সংস্করণঃ ১৪১৭ হি.]
.
এটি আল হিদায়া কিতাবের বক্তব্য। লা-মাযহাবী, কথিত আহলে হাদীস ভাইয়েরা যেহেতু বাংলা মুজতাহিদ, বাংলা মুফতী ও বাংলা মুহাদ্দিস তাই তাদের ক্ষমতা হয় নাই, আল হিদায়া কিতাবের আরবী ইবারত কিংবা পৃষ্ঠার স্ক্রীনশট দেখানোর। তাই ই.ফা.বা. প্রকাশিত বাংলায় আল হিদায়া এর অনুবাদের স্ক্রীনশট দেখিয়ে বেরাচ্ছে।
.
এবার সরাসরি জাবাবে চলে যাই,
.
প্রথম কথাঃ শুধু ইমাম শাফেয়ী (রহ.) কেন, মুসলিম উম্মাহ’র প্রসিদ্ধ কোনো একজন মুজতাহিদ ইমাম হতেও বুকে হাত বাঁধার কথা বর্ণিত নেই। সকলেই নাভীর নিচে কিংবা নাভীর উপর (বুকের নিচে) হাত বাঁধার কথা বলেছেন।
.
হাত বাঁধা বিষয়ে ইমামগণের বক্তব্য সংক্ষেপে উল্লেখ করছিঃ
.
ইমাম আবূ হানীফা, আবূ ইউসুফ, মুহাম্মাদ, আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.)'র মতে নাভীর নিচে (তাহতাস সুররাহ) হাত বাঁধবে।
.
ইমাম মালিকের একটি মত, ইমাম শাফেয়ী এবং ইমাম আহমাদ (রহ.)'র অপর মত অনুযায়ী হাত নাভীর উপর (ফাওকাস সুররাহ/তাহতাস সদর) বুকের নিচে হাত বাঁধবে।
.
[ইখতিলাফুল আইম্মাতুল উলামা, কাযী ইবনে হুবাইরাহ হাম্বলী]
.
দ্বিতীয়ত হাত বাঁধা বিষয়ে ইমাম শাফেয়ী (রহ.)'র মত কী?
.
পূর্বেই উল্লেখ করেছি, ইমাম শাফেয়ীর মতে হাত বাঁধবে বুকের নিচে নাভী হতে উপরে। এ বিষয়ে প্রখ্যাত শাফেয়ী ফকীহ ও মুহাদ্দিস, ইমাম নববী (রহ.) বলেন,
.
ﻣَﺬْﻫَﺒَﻨَﺎ ﺃَﻥَّ ﺍﻟْﻤُﺴْﺘَﺤَﺐَّ ﺟَﻌْﻠُﻬُﻤَﺎ ﺗَﺤْﺖَ ﺻَﺪْﺭِﻩِ ﻓَﻮْﻕَ ﺳُﺮَّﺗِﻪِ ﻭَﺑِﻬَﺬَﺍ ﻗَﺎﻝَ ﺳَﻌِﻴﺪُ ﺑْﻦُ ﺟُﺒَﻴْﺮٍ ﻭَﺩَﺍﻭُﺩ
.
অর্থাৎ ‘‘আমাদের (শাফেয়ী) মাযহাব হলো, উভয় হাত বুকের নিচে নাভী হতে উপরে বাঁধবে। যেমনটি বলেছেন, সাঈদ ইবনু জুবাইর এবং দাউদ।’’
.
তিনি আরো বলেছেন,
.
ﻭﻳﺠﻌﻠﻬﻤﺎ ﺗﺤﺖ ﺻﺪﺭﻩ ﻭﻓﻮﻕ ﺳﺮﺗﻪ، ﻫﺬﺍ ﻫﻮ ﺍﻟﺼﺤﻴﺢ ﺍﻟﻤﻨﺼﻮﺹ، ﻭﻓﻴﻪ ﻭﺟﻪ ﻣﺸﻬﻮﺭ ﻷﺑﻲ ﺇﺳﺤﺎﻕ ﺍﻟﻤﺮﻭﺯﻱ ﺃﻧﻪ ﻳﺠﻌﻠﻬﻤﺎ ﺗﺤﺖ ﺳﺮﺗﻪ، ﻭﺍﻟﻤﺬﻫﺐ ﺍﻷﻭﻝ
.
অর্থাৎ ‘‘আর দুই হাত তার বুকের নিচে নাভী থেকে উপরে বাঁধবে, এটাই সহীহ বক্তব্য। আর আমাদের ইমাম ইসহাক আল মারওয়াযী (রহ.) হতে বর্ণিত, তিনি নাভীর নিচে হাত বাঁধতেন।’'
.
[আল মাজমু শরহুল মুহাযযাব ৩/২৬৮। আরো দেখা যেতে পারে, আল মিনহাজ ‘আননাজমুল ওয়াহহাজ-এর সাথে মুদ্রিত’ ২/১৮০; আলমাজমূ ৩/২৬৯]
.
ইমাম ইসহাক আল মারওয়াযী (রহ.) সম্পর্কে কিছু বলি। তিনি শাফেয়ী মাযহাবের অনেক বড় ফকীহ ছিলেন। তিনি ৯ই রজব, ৩৪০ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন। বুঝাই যাচ্ছে তিনি কত পূর্বের ব্যক্তিত্ব ছিলেন। আর তাঁর সময়কালে সবচাইতে বড় শাফেয়ী ফকীহ ছিলেন। তিনি নাভীর নিচে হাত বাঁধতেন। তাঁর সম্পর্কে ইমাম যাহাবী (রহ.) বলেন,
.
ﺍﻹﻣﺎﻡ ﺍﻟﻜﺒﻴﺮ ، ﺷﻴﺦ ﺍﻟﺸﺎﻓﻌﻴﺔ ، ﻭﻓﻘﻴﻪ ﺑﻐﺪﺍﺩ ﺃﺑﻮ ﺇﺳﺤﺎﻕ ﺇﺑﺮﺍﻫﻴﻢ ﺑﻦ ﺃﺣﻤﺪ ﺍﻟﻤﺮﻭﺯﻱ
.
অর্থাৎ ‘‘তিনি মহান ইমাম, শাফেয়ী শায়খ, বাগদাদের ফকীহ আবূ ইসহাক ইবরাহীম ইবনু আহমাদ আল মারওয়াযী।’’
.
[সিয়ার লিয যাহাবী, ১৫/৪৯৩]
.
তো ইমাম নববী (রহ.)'র বক্তব্য দ্বারা এটা পরিষ্কার যে, ইমাম শাফেয়ী (রহ.)'র মত ছিল নাভী থেকে উপরে বুকের নিচে হাত বাঁধা।
.
ইমাম তিরমিযী (রহ.) বলেন,
.
ﺭﺃﻯ ﺑﻌﻀﻬﻢ ﺃﻥ ﻳﻀﻌﻬﻤﺎ ﻓﻮﻕ ﺳﺮﺗﻪ ، ﻭﺭﺃﻯ ﺑﻌﻀﻬﻢ ﺃﻥ ﻳﻀﻌﻬﻤﺎ ﺗﺤﺖ ﺳﺮﺗﻪ ، ﻛﻞ ﺫَﻟِﻚَ ﻭﺍﺳﻊ ﻋﻨﺪﻫﻢ
.
অর্থাৎ ‘‘আর আহলুল ইলমগণের মধ্যে হতে সাহাবী, তাবেয়ী ও তাঁদের পরবর্তীদের হতে বর্ণিত আছে, তাঁদের কেউ উভয় হাত নাভীর উপর আবার কেউ কেউ উভয় হাত নাভীর নিচে বাঁধতেন। তাঁদের নিকট উভয়টিরই প্রশস্ততা ছিল।’'
.
[তিরমিযী]
.
ইমাম তিরমিযী (রহ.) সাহাবী, তাবেয়ী এবং ইমামদের মত উল্লেখ করলেন, অথচ বুকের উপরের কোনো মত উল্লেখ করলেন না। যদি কোনো ইমামের মত থাকতো, তাহলে অবশ্যই উল্লেখ করতেন।
.
ইমাম শাফেয়ীর ঘনিষ্ঠ ছাত্র ইমাম আহমাদ বিন হাম্বলের নিকট বুকে হাত বাঁধা মাকরূহ।
.
[মাসাইলুল ইমাম আহমাদ, লি আবূ দাউদ; পৃ. ৪৮]
.
যদি ইমাম শাফেয়ীর মত বুকে হাত বাঁধা হতো, তাহলে তিনি সেই মতটিকে খণ্ডণ করতেন। কিন্তু ইমাম শাফেয়ী হতে বুকে হতে বুকে হাত বাঁধার বক্তব্য নেই বিধায় তিনি তা খণ্ডণও করেন নি।
.
সর্বশেষ কথঃ তাহলে আল হিদায়া কিতাবের গ্রন্থাকার ইমাম মারগীনানী (রহ.) কেন বললেন, ইমাম শাফেয়ীর মত বুকে হাত বাঁধা?
.
জবাবে বলবো, এই সকল লা-মাযহাবী ভাইয়েরা সারাদিন আল হিদায়া কিতাবটিকে গালি দেন। এটা নর্দমার কিতাব, ডাস্টবিনের কিতাব। এই কিতাবে ইমাম আবূ হানীফার বক্তব্যের কোনো সনদ বা সূত্র নেই। ইত্যাদি জাহেলের মতো কথা বলে। অথচ এখন সেই হেদায়া কিতাবের গ্রন্থাকারেরই তাকলিদ করতেছে।
.
সাহিবুল হিদায়া ইমাম শাফেয়ীর বক্তব্যের কোনো সূত্র বা রেফারেন্স উল্লেখ করেছেন? করেন নি। আল হিদায়ার টীকাতেও কোনো কিতাবের নাম নেই।
.
আসলে মুতাআখখিরীন (পরবর্তী) কিছু শাফেয়ী আলেম বুকে হাত বাঁধার কথা বলেছেন। তাঁরা তাঁদের কিতাবে এটিকে ইমাম শাফেয়ীর মত বলেছেন, যা সঠিক নয়। এই কিতাবগুলো হতেই হয়ত সাহিবুল হিদায়া ইমাম মারগীনানী উল্লেখ করেছেন, ইমাম শাফেয়ীর মত বুকে হাত বাঁধা।
.
সুতরাং শুধু শুধু লাফালাফি করার কোনো মানেই হয় না। উম্মাতের কোনো একজন ইমাম হতেও বুকে হাত বাঁধার কথা বর্ণিত হয় নি। ইমাম আওযায়ী (রহ.), যিনি মুজতাহিদ ইমাম ছিলেন। সহীহ বুখারীর রাবী। তিনি বলেছেন, ‘‘হাত না বাঁধলেও সমস্যা নেই।’’
.
তাহলে শুধু শুধু ফিৎনা ছড়ানোর মানেই হয় না।

মন্তব্যসমূহ

এই সপ্তাহে সর্বাধিক পঠিত

ডাউনলোড করুন মাকতাবায়ে শামেলা লেটেস্ট ভার্শন (মোবাইল এবং পিসির জন্য)

রুকইয়াহ আশ-শারইয়্যাহ (ডাউনলোড)

ইসতিখারার সুন্নত তরিকা + pdf